রবিবার, ২৯ জানুয়ারী ২০২৩ ইং         ০৩:৫১ অপরাহ্ন
  • মেনু নির্বাচন করুন

    শিক্ষার্থীরা কেমন বিশ্ববিদ্যালয় চায়?


    প্রকাশিতঃ 15 Jan 2023 ইং
    ভিউ- 0
    শেয়ার করুনঃ

    মন্তব্য প্রতিবেদনঃ


    বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় বলতে নানাধরণের অপকর্ম আর বিতর্ক গুলো সামনে নিয়ে আসে।এবং এর পিছনে সবচেয়ে বড় দায় হচ্ছে কিছু ছাত্র সংগঠন এবং কিছু নানারূপি শিক্ষক সিন্ডিকেট। বাংলাদেশে একসময় বিশ্ববিদ্যালয় বলতেই ১৯৭৩ সালের অধ্যাদেশনির্ভর স্বায়ত্তশাসিত চারটি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা ভাবা হতো। কিন্তু এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি এর প্রকৃতিও বিচিত্র হয়েছে। প্রায় ৪০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে রয়েছে প্রায় ১০০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের যেমন প্রকৃতিগত পার্থক্য রয়েছে, তেমনি পুরোনো স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে ১৯৭৩ অধ্যাদেশের বাইরের সাধারণ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যেও রয়েছে প্রকৃতিগত পার্থক্য। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সার্বিক মানের অবনমন ঘটেছে বলে একটি ধারণা ধীরে ধীরে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় দলীয় রাজনীতি শিক্ষাগত মানের ওপর প্রভুত্ব করছে। অল্প কয়েকটি বাদ দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু সনদ বিক্রির ভবনে পরিণত হয়েছে। এতে পড়াশোনা মান দিন দিন নষ্ট হয়ে টাকার কাগজে পিছনে দাঁড়াচ্ছে ছাত্র শিক্ষা ও অভিভাবক। 

    বিশ্ববিদ্যালয় জীবন?

    বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা হচ্ছে একজন ছাত্রের জীবনে সর্বচ্চ পর্যায়ের শিক্ষা। এই জন্য আমরা এই শিক্ষাকে উচ্চশিক্ষা বলি। এই উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ছেলে-মেয়েরা দেশ গঠনে সক্রিয় ভুমিকা রাখবে এটাই সবার প্রত্যাশা। কিন্তু আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান এখনও আমরা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিতে পারিনি। বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের মানদণ্ডের যে ক্রম তাতে আমাদের অবস্থান খুঁজে পাওয়া যায় না। আমরা কেন তলানিতে পরে আছি? বিশ্বায়নের এই দিনে আমরা তো পিছিয়ে থাকার কথা না! তাহলে আমাদের সমস্যা কোথায়? প্রথমে আমাদের সমস্যাগুলো খুঁজে বের করে, যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহনের মধ্যমে আন্তরিকতার সাথে সেগুলো সমাধান করে এগিয়ে গেলেই আমরা সেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পোঁছিতে পারবো বলে আমার বিশ্বাস।


    ১। প্রথমে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে একটি কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে এবং ছাত্ররাজনীতি সুন্দর স্বচ্ছন্দ করতে হবে। প্রত্যেকটা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে নিজস্ব নিয়ম আছে তা দিয়েই এটা করা সম্ভব। প্রয়োজনে নুতন আইন করা যেতে পারে।

    ২। একটি উন্নত বাংলাদেশ গঠনে গবেষণার উপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে, দেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়সমূহকে বিশেষ বারদ্দ প্রদান সাপেক্ষে টার্গেট নির্ধারণ করতে হবে। গবেষণা কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদ-দের দ্বারা মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে।

    ৩। বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষকগণের মূল কাজ হবে পাঠদান ও গবেষণা এবং ছাত্রছাত্রীদের আধুনিক জ্ঞান অর্জনে পড়াশুনায় বিশেষ মনযোগী হতে হবে।

    ৪। দক্ষ প্রশাসনিক দ্বারা প্রশাসন পরিচালনা করে শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ তৈরি করতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের অধিকার সুরক্ষনের ক্ষেত্রে বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে।

    ৫। ছাত্রছাত্রীরা যাতে নিয়মতান্ত্রিকভাবে আবাসিক হলে থেকে পড়াশুনার পরিবেশ পায়, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে তা নিশ্চিত করতে হবে। ইন্টারনেট ও অন্যান্য প্রযুক্তিগত সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। আবাসিক হলের ধারন ক্ষমতা পর্যাপ্ত না হলে, বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ প্রাইভেট হাউসিং এর ব্যবস্থা করে ছাত্রছাত্রীদের আবাসিক সমস্যা সমাধানে সহায়তা করতে পারে।

    ৬। মানসম্মত শিক্ষা প্রদান করার ক্ষেত্রে আর্থিক বরদ্দ বৃদ্ধি করা সময়ের দাবী। উচ্চ শিক্ষা কখনই অবৈতনিক হয় না। অবশ্যই টিউশন ফি যুক্তিসঙ্গত হারে বাড়াতে হবে। গরিব ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের প্রয়োজনে বৃত্তির ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

    ৭। দেশের মধ্যে অবস্থিত বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতাল গুলোর মধ্যে গবেষণা ব্রিজ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি, বিশ্বের বিভিন্ন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়/গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে শিক্ষা-বিনিময় চুক্তি করতে হবে।

    ৮। বিভিন্ন সেক্টরের বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানি-গন সম্পুরক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা ইন্ডাস্ট্রির মান উন্নতকরনে তাদের মতামত দিবেন।গবেষণায় প্রাপ্ত ফলাফল দেশের মানুষের কল্যাণে আসলেই কেবল শিক্ষার আসল মর্যাদা রক্ষিত হবে।

    আর এভাবেই আমরা একদিন বিশ্ব-দরবারে নিজেদের জায়গা করে নিতে পারবো।


    সংকটগুলো চিহ্নিত,যেমন-


    সরকারি কতৃক:

    সরকারি কর্তৃত্ব দলীয় রাজনীতিবাহিত হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন হরণ করছে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার ওপর দলীয় রাজনীতির চর্চা প্রভুত্ব করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে পদ-সম্পদ-প্রমোশন বাঁটোয়ারার নীতি শিক্ষকদের দলীয় রাজনীতিমুখী করে তোলে।


    নয়া উদারবাদী নীতি ও ইউজিসির কৌশলপত্র:

    বিশ্বব্যাংকের মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান নয়া উদারবাদের নীতি অবলম্বনে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে, মানোন্নয়নের নাম দিয়ে সর্বজনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে বেসরকারীকরণের উপাদান প্রবিষ্ট করছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ২০ বছর মেয়াদি (২০০৬-২০২৬) কৌশলপত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ আয় বৃদ্ধি করতে ও সরকারি বরাদ্দ কমাতে নীতিগত চাপ প্রয়োগ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এখন সান্ধ্য কোর্স, বৈকালিক কোর্স, ছুটির দিনে বিশেষ প্রোগ্রাম চলছে। এই মুক্তবাজার আবহাওয়ায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় মেধাবী অথচ দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়ার সুযোগ ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠছে।


    স্বায়ত্তশাসনের অপব্যবহার:

    পাকিস্তানি সামরিক শাসকেরা পাকিস্তান আমলে বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ন্ত্রণে আনতে নানান উদ্যোগ নিয়েছিল। তার বিপরীতে ৭৩–এর আদেশ একটি অর্জন হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু অধ্যাদেশটি শতবর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয় কোন স্থানে পৌঁছাবে, তার দিকনির্দেশনা দেয়নি। অন্যদিকে, শিক্ষকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দেওয়া হলেও মূলত দলীয় রাজনীতিপ্রধান হয়ে উঠেছে এবং সরকারদলীয় শিক্ষকনেতাদের দাপট বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে পড়েছে নির্বাচনকেন্দ্রিক, ক্যাম্পাস প্রাঙ্গণে বছরজুড়ে শিক্ষকদের নানান নির্বাচন হয়ে থাকে। অথচ জবাবদিহির অভাবে পাঠদানে শিক্ষকেরা অবহেলা করে থাকেন, স্বায়ত্তশাসনের সুযোগকে এ ক্ষেত্রে যুক্তি হিসেবে হাজির করা হয়। এ ছাড়া অধ্যাদেশটি শিক্ষকদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতারও দিকনির্দেশনা দেয় না। সরকারি আধিপত্য কমানো আর গণতান্ত্রিক ও জ্ঞানমুখী পরিবেশ নিশ্চিত করতে স্বায়ত্তশাসনের সংস্কার প্রয়োজন।


    শিক্ষায় বরাদ্দ ও গবেষণা :

    জিডিপি বা বাজেটের বিপরীতে শিক্ষায় বরাদ্দের হারে দক্ষিণ এশীয় মানের তুলনায়ও বাংলাদেশ পিছিয়ে আছে। একদিকে গবেষণার তহবিলের বরাদ্দ নেই, অন্যদিকে হীন দলীয় রাজনীতি গবেষণামনস্ক শিক্ষকদের জন্য নানান প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে, যে ক্ষেত্রে গবেষণাবিমুখ ও রাজনীতিপ্রবণ শিক্ষকদের জন্য রয়েছে বহাল তবিয়তে থাকার নানান উপায়। আবার শিক্ষার্থীদের পিএইচডি-এমফিল গবেষণার জন্য নেই সুষ্ঠু পরিকাঠামো। এ দেশের গবেষকেরা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশেই গিয়ে থাকেন, দেশের পিএইচডির মানও নেই, মূল্যও নেই।


    অস্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়:

    অস্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে রয়েছে নানান ধরন। যেমন: প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়, সেনা বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় পরিস্থিতি বেশ শোচনীয়। সব ক্ষমতা উপাচার্যের কাছে কেন্দ্রীভূত এবং সেই উপাচার্য যেহেতু দলীয় আনুগত্যে মনোনীত হন, তাই শিক্ষকদের স্বাভাবিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নেই। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন আইন দিয়ে চলছে। সব বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিষয় কেবল সাধারণ—গণতান্ত্রিক উপাদানের ঘাটতি এবং কেন্দ্রীভূত প্রশাসনব্যবস্থা।


    নিয়োগ ও ভর্তি:

    শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ভালো ফলের শিক্ষার্থীই গুরুত্ব পাওয়ার কথা। কিন্তু তাঁদের বাদ দিয়ে দলীয় বিবেচনায় ‘ভোটার’ নিয়োগের প্রবণতা দিন দিনই বাড়ছে। অন্যদিকে, এমসিকিউনির্ভর ভর্তিপ্রক্রিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপযোগী কাঙ্ক্ষিত শিক্ষার্থীদের সব সময় পাওয়া যায় না। শ্রেণিকক্ষের গড় মান এভাবে পড়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ধরনও বিভিন্ন। ভর্তি পরীক্ষা থেকে শিক্ষকদের উপার্জন বাড়ে, কিন্তু শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিও পাল্লা দিয়ে বাড়ে।


    শিক্ষার্থীদের আবাসন ও ছাত্ররাজনীতি:

    কোনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের আবাসনসংকটের সুযোগে গড়ে উঠেছে গণরুমপ্রবণতা, গেস্টরুম সংস্কৃতি ও সাধারণ ছাত্রদের ওপর সরকারি ছাত্রসংগঠনের নিয়ন্ত্রণমূলক রেজিমেন্টেশন। ছাত্রাবাসগুলোয় বসবাসের ও অধ্যয়নের ন্যূনতম পরিবেশ নেই। বরং নিবর্তন ও মাস্তানির সূত্রে রয়েছে এক ভীতিকর পরিবেশ, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূলনীতির পরিপন্থী এবং শিক্ষার্থীদের উদার ও মুক্তচিন্তা বিকশিত হওয়ার পথে বাধাস্বরূপ। সরকারি ছাড়া বাকি সংগঠনকে এক নিয়ন্ত্রণমূলক পরিবেশের মধ্যে রাজনীতি করতে হচ্ছে।


    বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়:

    বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমরূপ বা হোমোজেনাস নয়। তাদের মধ্যেও রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য। অল্প কয়েকটির মান যথেষ্ট উন্নত (যদিও সেখানে টিউশন ফি অত্যন্ত উচ্চ), বেশির ভাগের মান বেশ নিম্ন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত মুনাফামুখী, সে তুলনায় মান অর্জনে আগ্রহ কম। এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। তাদের এমফিল ও পিএইচডি ডিগ্রি দেওয়ার অনুমতি নেই।


    পরিশেষে- বিশ্ববিদ্যালয় সকল সংকট সমস্যা ও সিন্ডিকেট দূর হয়ে এগিয়ে যাক আরো সুন্দর আগামী। বাংলাদেশ হবে একটা উন্নত, সমৃদ্ধশালী দেশ।


    কে এম নেছার উদ্দিন। 

    সরকারি তিতুমীর কলেজ। ঢাকা।


    আপনার মন্তব্য লিখুন
    © 2023 muktir71news.com All Right Reserved.